ডিএসসিসিতে ৬১১৯ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা

img

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ 

ঢাকার উন্নয়ন কার্যক্রম এগিয়ে নিতে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ‘মহা পরিকল্পনা’ হাতে নিয়েছে বলে জানিয়েছেন মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস। তিনি বলেন, এই উন্নয়ন হবে সব সংস্থার মধ্যে সমন্বয় করে, ঢাকা নিয়ে আর কাউকে ‘ছেলেখেলা’ করতে দেব না।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথম বাজেট ঘোষণা করলেন মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস। উন্নয়নকে গুরুত্ব দিয়ে ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য ৬ হাজার ১১৯ কোটি ৫৯ লাখ টাকার বাজেট ঘোষণা করেছেন তিনি। এটি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার পর সবচেয়ে বড় বাজেট।

বৃহস্পতিবার নগর ভবনে ঢাকা দক্ষিণ সিটির মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস এ বাজেট ঘোষণা করেন।

বাজেটে উন্নয়নকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে উল্লেখ করে মেয়র তাপস বলেন, ‘নতুন অর্থবছরের জন্য ৬ হাজার ১১৯ কোটি ৫৯ লাখ টাকার বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। বাজেটের বেশির ভাগ আয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে সরকারি ও বৈদেশিক উৎস থেকে।‘

এসময় মেয়র জানান, নতুন অর্থবছরে অন্তত ১৭টি উন্নয়নমূলক খাতে নতুন করে টাকা খরচ করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে মোট রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৯ কোটি ২ লাখ টাকা, অন্যান্য আয় ধরা হয়েছে ৭ কোটি ৭০ লাখ টাকা, সরকারি ও বৈদেশিক উৎস থেকে আয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ৯১৬ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। প্রারম্ভিক স্থিতি ১৮৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা।

বাজেটে পরিচালনা ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫৭ কোটি ২৩ লাখ টাকা, অন্যান্য ব্যয় ২ কোটি টাকা, মোট উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ হাজার ৫০৫ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। সমাপনী স্থিতি ধরা হয়েছে ১৫৪ কোটি ৫২ লাখ টাকা।

বাজেটে মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে সমন্বিত মশকনিধন কার্যক্রমে বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। জলাবদ্ধতা নিরসনে ৩০০ কোটি টাকা, কামরাঙ্গীরচরে নতুন শহর আধুনিকায়ন করার কাজে ২০০ কোটি, খাল-জলাশয়, পার্ক-উদ্যান উন্নয়ন করে সুন্দর ও নান্দনিক ঢাকা বিনির্মাণে ৩০০ কোটি টাকা, বুড়িগঙ্গার তীরে জমি অধিগ্রহণ করে রাস্তা ও নান্দনিক পার্ক নির্মাণে ২৫০ কোটি, বিনোদন সেবা প্রদানের লক্ষ্যে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে কেন্দ্রীয় শিশু পার্কের আধুনিকায়নের কাজে ৩০০ কোটি টাকা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য অত্যাধুনিক যান ও যন্ত্রপাতি কিনতে ২৯০ কোটি টাকা ব্যয় করার পরিকল্পনা রাখা হয়েছে।

গত অর্থবছরে দক্ষিণ সিটির সংশোধিত বাজেটের আকার ছিল ২৫৮৫ কোটি ৩১ লাখ টাকা।

বাজেট বক্তৃতায় মেয়র তাপস বলেন, এবারের বাজেটে ‘বটম-আপ পলিসিকে’ গুরুত্ব দিয়ে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত কাউন্সিলর ও সংসদ সদস্যদের উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানো হয়েছে। নগরবাসীর জীবনমান উন্নয়ন ও নাগরিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে ১৯টি নতুন প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

ডিএসসিসি মেয়র বলেন বলেন, বাজেটে মহা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কামরাঙ্গীরচরে একটি ‘সেন্ট্রাল বিজনেস ডিস্ট্রিক্ট’ করা হবে। একটি শহরের চারদিকে নদী বেষ্টিত, এমন শহর পৃথিবীতে বিরল। কিন্তু বুড়িগঙ্গার সন্তান, আমাদের সকলের প্রাণের এই ঢাকা শহরের জনগণকে নাগরিক সুবিধা দেওয়ার প্রচেষ্টা থাকলেও তা সবসময় প্রদান করা সম্ভব হয়নি। তাই সহজতর ও কার্যকর উপায়ে নাগরিক সেবা প্রদানের লক্ষ্যে আমরা মহাপরিকল্পনার আওতায় কামরাঙ্গীর চরে একটি সেন্ট্রাল বিজনেস ডিস্ট্রিক্ট করতে চাই।

উন্নয়নের নামে অপরিকল্পিত কর্মযজ্ঞ বন্ধের ওপর জোর দিয়ে শেখ ফজলে নূর তাপস বলেন, বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থার সমন্বয়হীনতায় শিল্পায়নের নামে অপরিকল্পিত কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই নগরকে আমরা দিনে দিনে এক রুগ্ন স্বত্ত্বায় পরিণত করে চলেছি। এটা সত্যি যে, দেশের অর্থনৈতিক এবং সামগ্রিক উন্নয়নে শিল্পায়ন অতীব গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ।কিন্তু বেঁচে থাকতে হলে মানুষের যেমন শিরা-উপশিরায় রক্ত প্রবাহ ও অক্সিজেন সঞ্চালন অত্যাবশ্যকীয়, তেমনি একটি শহরের বেঁচে থাকা নির্ভর করে তার নর্দমা ব্যবস্থাপনা, শহরের বুক চিরে বয়ে চলা খাল, নদ-নদীর প্রবাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখা এবং দূষণ-দখল প্রতিরোধের ওপর।

তাপস বলেন, শিল্পায়ন ও নাগরিক সুবিধার নামে আমরা এই শহরের নদ-নদীগুলো দখল, দূষণ ও ভরাট করে চলেছি। জলাধারগুলো নিশ্চল-নিথর করতে সম্পন্ন করেছি সকল আয়োজন। যত্রতত্র ফেলছি ময়লা-আবর্জনা, গতি রোধ করছি নর্দমাগুলোর। এভাবে চলতে দেয়া সমীচীন নয়।

এই সমন্বয়হীনতার দেয়াল ভেঙ্গে দখল-দূষণের বিরুদ্ধে ‘প্রতিরোধ গড়ে’, জলাশয়গুলোকে ‘সচল করে’, অপরিকল্পিত শিল্পায়নের বিরুদ্ধে ‘সরব হয়ে’ পরিবেশ-প্রতিবেশের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান দক্ষিণের মেয়র।

তিনি বলেন, নগরকে সবুজে ঢেকে দিতে জন-দুর্ভোগ বিবেচনায় নিয়ে উন্নয়নমূলক কর্মসূচি ও প্রকল্প বাস্তবায়নে গুরত্বারোপ করার সময় এখন।

ঢাকার রাস্তায় কোনো ময়লা ফেলা যাবে না জানিয়ে তাপস বলেন, রাস্তায় ময়লা ফেরার কোনো সুযোগ থাকবে না, এমনকি ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় যে সব ময়লার কনটেইনার ছিল, সেগুলোও রাখা হবে না। তার যুক্তি, কনটেইনারে বর্জ্য রাখা হলে তার পাশে রাস্তার ওপরেও ময়লার স্তূপ পড়ে থাকতে দেখা যায়।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম ঢেলে সাজানোর কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ডিএসসিসির ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ২৪টিতে অন্তর্বর্তীকালীণ বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। বেশ কয়েকটি ওয়ার্ডে জায়গা নির্ধারণ করা হলেও নানা জটিলতায় তা আটকে ছিল। আশা করছি এই ডিসেম্বরের মধ্যে আমরা ৩১টি ওয়ার্ডে এসটিএস নির্মাণে সফল হব। পাশাপাশি প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে এসটিএস নির্মাণ করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে আমি ইতোমধ্যে নির্দেশনা দিয়েছি।

তিনি জানান, রাত ১০টা থেকে ভোর ৬টার মধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্র থেকে আবর্জনা নিয়ে যাওয়া হবে মাতুয়াইলের ভাগাড়ে (ল্যান্ডফিল)। রাত ৯টা থেকে পরিচ্ছন্নকর্মীরা ঢাকা শহরের রাস্তাগুলোতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ শুরু করবেন।

বাজেট ঘোষণা অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শাহ ইমদাদুল হকসহ ডিএসসিসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।