আজ রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের শেষকৃত্য

img

আন্তর্জাতিক প্রতিবেদক: 

ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের শেষকৃত্য আজ। ব্রিটিশ রাজপরিবারের ঐতিহ্য অনুসারে তার শেষকৃত্য অনুষ্ঠান সম্পূর্ণ হবে। এই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ইতোমধ্যে বিশ্ব নেতারা লন্ডনে পৌঁছেছেন।

ব্রিটিশ রাজসিংহাসনের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সময় শাসন করা রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ গত ৮ সেপ্টেম্বর তিনি স্কটল্যান্ডের বালমোরাল প্রাসাদে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ৯৬ বছর বয়সী রানির মৃত্যুতে ব্রিটেনজুড়ে নেমে আসে শোকের ছায়া। পরবর্তীতে রানির জ্যেষ্ঠ পুত্র তৃতীয় চার্লস নতুন রাজা হিসেবে আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

৮ থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রানির মৃত্যুতে রাজপরিবারের রীতি অনুযায়ী বিভিন্ন শোক পালন করা হয়। গত চারদিন সাধারণ জনগণের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য ব্রিটিশ সরকারের প্রাণকেন্দ্র ওয়েস্টমিনস্টার প্যালেসের সবচেয়ে পুরনো অংশে অবস্থিত বিশাল হলঘরে রাখা হয়।

২০০২ সালে সর্বশেষ এই হলঘরে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের মা কুইন মাদারের মরদেহ রাখা হয়েছিল। তখন দুই লাখ মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে রানির প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেছিলেন।

লন্ডনের ওয়েস্ট মিনিস্টার হলে স্থানীয় সময় সকাল ৬টা ৩০ মিনিটে রানিকে জনগণের শ্রদ্ধা জানানো শেষ হয়েছে। সকাল ১০টা ৪৪ মিনিটে রানির কফিন ওয়েস্টমিনিস্টার প্রাসাদ রাজকীয় নৌবাহিনীর কামানবাহী শকট করে রানির কফিন সেন্ট্রাল লন্ডনের ওয়েস্টমিনিস্টার অ্যাবেতে নেওয়া হবে।

ওই রাষ্ট্রীয় শকটটিও ১৯৭৯ সালে শেষ দেখা গিয়েছিল। সেসময় প্রিন্স ফিলিপের চাচা লর্ড মাউন্টব্যাটেনের শেষকৃত্যে তা রয়্যাল নেভির ১৪২ জন নাবিক টেনে নিয়ে যায়। এবারও রানির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় ১৪২ জন নেভির সদস্য থাকবেন।

এসময় নতুন রাজা তৃতীয় চার্লস, তার ছেলে প্রিন্স উইলিয়াম এবং প্রিন্স হ্যারির নেতৃত্বে রয়েল পরিবারের সদস্যরা শোভাযাত্রা সহযোগে কফিনের পাশে পায়ে হেঁটে অ্যাবেতে পৌঁছাবেন।

স্থানীয় সময় সকাল ১১টা থেকে রানির রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার অনুষ্ঠান শুরু হবে। ১১ টা ৪৫ মিনিটে দুই মিনিটের জাতীয় নিরবতা পালনা করা হবে।

ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবে একটি ঐতিহাসিক গীর্জা। এখানেই রানি ১৯৫৩ সালে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের অভিষেক অনুষ্ঠান হয়েছে। আর এখানেই ১৯৪৭ সালে প্রিন্স ফিলিপের সঙ্গে বিয়ে হয়। তবে অষ্টাদশ শতাব্দীর (১৭৬০ সালের) পর থেকে এই গীর্জায় কোন রাজা বা রানির শেষকৃত্যানুষ্ঠান হয়নি। ২০০২ সালে সর্বশেষ রানির শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।

রানির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াকে কেন্দ্র করে আগামীকাল অন্যান্য ব্যবসার পাশাপাশি বহু সিনেমা হল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া আজ সব ব্যাংকে ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার কারণে পর্পকন, হট ডগস এবং মিষ্টি বিক্রি করা হবে না।

রানির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর লন্ডনের কেন্দ্রে হাইড পার্ক কর্নারে ওয়েলিংটন আর্চ নামে এক ঐতিহাসিক খিলান স্তম্ভে নিয়ে যাওয়া হবে। সেখান থেকে তার কফিনবাহী শকট উইন্ডসর রাজপ্রাসাদের উদ্দেশ্যে রওনা হবে। পরে উইন্ডসর ক্যাসেলের সেন্ট জর্জেস চ্যাপেলে রানির মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে।

রানির মরদেহ দাফনের প্রার্থনা অনুষ্ঠানের আগে উইন্ডসর কাসেলের চৌকনো চত্বরে রাজা তৃতীয় চার্লস এবং রাজ পরিবারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের শোভাযাত্রায় অংশ নেবার পরিকল্পনা রয়েছে।

ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্যরা সচরাচর সেন্ট জর্জেস চ্যাপেল নামে উইন্ডসরের এই গির্জাটিতে বিবাহ অনুষ্ঠান, সদ্যোজাতের জন্য ঈশ্বরের আর্শীবাদ প্রার্থনা অনুষ্ঠান এবং শেষকৃত্যানুষ্ঠানের জন্য। এই গির্জাতেই ডিউক ও ডাচেস অফ সাসেক্স, প্রিন্স হ্যারি ও মেগান বিয়ে করেছেন। এবং এই গির্জাতেই রানির প্রয়াত স্বামী প্রিন্স ফিলিপের শেষকৃত্যানুষ্ঠান সম্পূর্ণ হয়।

রাজপরিবারের সদস্যরা রানির কফিনের পাশে শোভাযাত্রা সহযোগে ওয়েলিংটন আর্চে যাবেন। পরে দীর্ঘ পথ হেঁটে রানির কফিনটি সেন্ট জর্জ চ্যাপেলে নিয়ে যাওয়া হবে। সন্ধ্যায় পরিবারের সদস্যরা রানিকে দাফনের অনুষ্ঠানে যোগদান করবেন।

রানির অন্ত্যোষ্টিক্রিয়ায় যোগদানের জন্য বিশ্বের সব দেশের নেতৃবৃন্দকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তবে বেলারুশ, রাশিয়া ও মিয়ানমারকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে সামরিক অভিযানের জেরে রাশিয়া ও বেলারুশের সঙ্গে ব্রিটেনের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অবনতি ঘটে। আর ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর নির্যাতনের কারণে মিয়ানমারের সঙ্গেও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বন্ধ রয়েছে।

বিবিসি বলছে, সোমবারের এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক ইভেন্টগুলোর মধ্যে একটি হতে চলেছে। এসময় এখানে প্রায় ৫০০ রাষ্ট্রপ্রধান এবং বিদেশি বিশিষ্ট অতিথি উপস্থিত থাকবেন বলে আশা করা হচ্ছে। বিশ্বের বহু দেশের রয়েল পরিবারের সদস্যরাও উপস্থিত থাকবেন।

রানির মৃত্যুতে কুইনস অব আওয়ার টাইমস গ্রন্থের লেখক রবার্ট হার্ডম্যান বলেন, তিনি (রানি) আমাদের ইতিহাসে অন্য যেকোনো রাজা-রানির চেয়ে ভিন্ন। তিনি আমাদের সবচেয়ে দীর্ঘজীবী, সবচেয়ে বেশি সময় দায়িত্ব পালনকারী, সবচেয়ে বেশি সময় সিংহাসনে থাকা রানি। হঠাৎ এমন এক সময়ে আমরা সবাই বুঝতে পারছি, তিনি কত মূল্যবান!’