রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে সহযোগিতা দেয়াসহ প্রধানমন্ত্রীর পাঁচ প্রস্তাব

img

নিজস্ব প্রতিবেদক:

নির্যাতনের মুখে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিতে তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা দেয়াসহ পাঁচটি পদক্ষেপ নিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কের লোটে প্যালেস হোটেলে রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এসব প্রস্তাব দেন তিনি।

বক্তব্যে প্রস্তাব তুলে ধরার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ ধীরে ধীরে মিয়ানমারের নতুন বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ সংঘাতের দিকে সরে যাওয়ায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘে সাধারণ পরিষদে যোগ দিতে নিউইয়র্ক অবস্থান করছেন।

বক্তব্যে শেখ হাসিনা বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে বাস্তব পদক্ষেপ এবং প্রকল্প প্রহণ করা দরকার।’

প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগ এবং মিয়ানমারে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে লড়াই জোরদার করার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক আদালত, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত এবং আইসিজেতে গাম্বিয়াকে সমর্থনের জোর দেন। এছাড়াও আন্তর্জাতিক আদালতের বিচারকাযের্র পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের রাজনৈতিক ও আর্থিকভাবে সমর্থন করার জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান।

তিনি জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অব্যাহত দমন-পীড়ন বন্ধে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টির প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। একই সঙ্গে মিয়ানমারকে আসিয়ানের পাঁচ-দফা ঐকমত্যের অধীনে তার অঙ্গীকার মেনে চলার জন্য জোর দেন। আর মিয়ানমার যাতে বাধাহীন মানবিক অ্যাক্সেস দিতে সম্মত হয় সে জন্য প্রচেষ্টা চালানোর অনুরোধ করেন।

বর্তমানে ৭৭তম ইউএনজিএ’তে যোগ দিতে নিউইয়র্কে অবস্থানরত প্রধানমন্ত্রী বলেন যে আঞ্চলিক সংস্থা হিসাবে আসিয়ান এবং পৃথক সদস্য রাষ্ট্রগুলো মিয়ানমারের সাথে তাদের গভীর ঐতিহাসিক সম্পর্ক ও লিভারেজ নিয়ে এমন সার্বিক সম্পৃক্ততায় প্রধান ভূমিকা নিতে পারে।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের জন্য নাগরিকত্বের পথ সুগম করাসহ রাখাইন রাজ্য বিষয়ক কফি আনান উপদেষ্টা কমিশনের সুপারিশসমূহ সম্পূর্ণরুপে বাস্তবায়নে তাদের ব্যাপক প্রচেষ্টা গ্রহণ করা উচিত।

তিনি আরও বলেন, বেসামরিক পর্যবেক্ষক হিসেবে তাদের অর্থবহ উপস্থিতি রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায় প্রত্যাবর্তনের আস্থা বাড়াবে।

প্রধানমন্ত্রী পুনর্ব্যক্ত করেছেন যে বাংলাদেশ ন্যায়বিচার থেকে দায়মুক্তির বিরুদ্ধে এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে যে কোনো উদ্যোগকে সমর্থন করবে।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, জাতিসংঘ ও আসিয়ানের বর্তমান ফোকাস মিয়ানমারে স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের তাদের স্বদেশে টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে এবং মিয়ানমারের জনগণের জন্য শান্তি ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতে বাংলাদেশ তাদের শক্তিশালী ভূমিকার জন্য অপেক্ষা করছে।

শেখ হাসিনা বলেন, বিশ্ব এখন বিশ্বজুড়ে উদ্ভূত নতুন নতুন সংঘাত প্রত্যক্ষ করছে এবং দুর্ভাগ্যবশত রোহিঙ্গা সংকটের রাজনৈতিক সমাধান ও এর ক্রমবর্ধমান মানবিক চাহিদা মেটানো দুটো থেকেই বিশ্বের মনোযোগ ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, ‘আগস্ট ২০২২ পর্যন্ত জেপিআর ২০২২-এর অধীনে আপিলকৃত ৮৮১ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের মাত্র ৪৮% অর্থায়ন করা হয়েছে। একই সময়ে মিয়ানমারে সাম্প্রতিক অভ্যন্তরীণ সংঘাতের বিরূপ প্রভাব আমাদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে, কারণ এটি তাদের প্রত্যাবাসন শুরুর করার সম্ভাবনার পথে আরও বাধা সৃষ্টি করতে পারে।

শেখ হাসিনা বৈশ্বিক সম্প্রদায়কে অভিহিত করেন যে একজন রোহিঙ্গাকেও ঘরে ফিরতে না দেখা অবস্থায় বাংলাদেশ এ প্রলম্বিত সংকটের ষষ্ঠ বছরে পা দিয়েছে।

তিনি বলেন, ‘বর্তমান সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং এর সমাধানও সেখানেই রয়েছে। ১৯৬০ সালের পর থেকে মিয়ানমারের ধারাবাহিক সরকারগুলো কর্তৃক রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে পদ্ধতিগতভাবে বর্জন ও নির্বিচার নিপীড়ন অব্যাহত রাখায় তাদের বাংলাদেশে অব্যাহত অনুপ্রবেশের দিকে চালিত করে।

 

তিনি বলেন, আজ, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিকদের (এফডিএমএন) মোট সংখ্যা প্রায় ১.২ মিলিয়ন।

তিনি তার গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের দীর্ঘস্থায়ী অবস্থান আমাদের উন্নয়ন আকাক্সক্ষার জন্য বিরাট চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

তিনি বলেন, ১.২ মিলিয়ন রোহিঙ্গার আতিথেয়তার প্রভাব বিভিন্ন ফ্রন্টে ছড়িয়ে পড়েছে। রোহিঙ্গাদের জন্য আমাদের প্রতি বছর প্রায় ১.২২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করতে হয়। এতে জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি, প্রায় ৬,৫০০ একর জমির বনভূমির ক্ষতি এবং স্থানীয় জনগণের ওপর এর বিরূপ প্রভাব অপরিমেয়।’

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ সামাজিক ও জনসংখ্যাগত ভারসাম্য, অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং সহিংস উগ্রবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়েরও ভার বহন করছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয়ভাবে জোরালো মানবিক ও রাজনৈতিক সমর্থনের জন্য বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে কৃতজ্ঞ।

তিনি বলেন, ‘স্বদেশে একটি উন্নত ও নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য অপেক্ষমান রোহিঙ্গাদের ভরণপোষণের জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের অব্যাহত সংহতি প্রয়োজন।’

প্রধানমন্ত্রী পর্যবেক্ষণ করেছেন যে কয়েকজন নির্বাচিত ব্যক্তির ওপর লক্ষ্যকৃত নিষেধাজ্ঞা মিয়ানমারের ওপর অবধারিত প্রভাব ফেলতে পারে না।

তিনি আরও বলেন, ‘মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের রাজনৈতিক সদিচ্ছা সংকট সমাধানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মিয়ানমারের সঙ্গে বাণিজ্য ও সামরিক সম্পর্ক বৃদ্ধি মিয়ানমারের স্বার্থের পক্ষে কাজ করছে।

বাংলাদেশ মনে করে যে রোহিঙ্গা সংকটের একটি টেকসই সমাধান এবং রোহিঙ্গাদের টেকসই প্রত্যাবাসনে একটি গুরুত্বপূর্ণ আস্থা নির্মাণের পদক্ষেপ খুঁজে পেতে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হবে।

 

শেখ হাসিনা বলেন, রোহিঙ্গারা ৮ম শতাব্দী থেকেই আরাকানে বসবাস করছে, যা এখন মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য। তিনি বলেন, ১৯৪৮ সালে মিয়ানমার স্বাধীন হওয়ার পর, দেশটির নতুন সরকার বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর এই দেশটির নাগরিক হওয়ার বিধান রেখে ইউনিয়ন সিটিজেনশিপ অ্যাক্ট পাশ করে। ১৯৮২ সালে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী থেকে পৃথক হিসেবে রোহিঙ্গাদের চিহ্নিত করে, নতুন একটি নাগরিকত্ব আইন পাশ করা হয়- যাতে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের ১৩৫টি স্বীকৃত জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে রাখা হয়নি। তিনি বলেন, ১৯৫২ সালে ইউ নু প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করে তার মন্ত্রিপরিষদে দুজন মুসলিম রোহিঙ্গা- ইউ রাশিদকে বাণিজ্য ও উন্নয়ন মন্ত্রী এবং সুলতান মাহমুদকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে স্থান দেন। এছাড়াও তার পার্লামেন্টে আব্দুল বাশার, মিসেস জোহরা বেগম, আবুল খায়ের, আব্দুস সোবহান, রাশিদ আহমেদ, নাসিরুদ্দিন এবং দুজন পার্লামেন্টারি সেক্রেটারি সুলতান আহমেদ ও আব্দুল গাফ্ফার স্থান পান। তিনি বলেন, ‘তাই এটা সহজেই বোধগম্য যে- মুসলিম রোহিঙ্গারা এখনো দেশটির নাগরিক, কারণ শুধুমাত্র কোন দেশের নাগরিকরাই সেই দেশের মন্ত্রিপরিষদ ও পার্লামেন্টের সদস্য হতে পারে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই সংকটের শুরু থেকেই বাংলাদেশ আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে একটি টেকসই ও শান্তিপূর্ণ সমাধান চেয়ে আসছে। ২০১৭ সালে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা জন¯্রােত শুরু পর দু’দেশের মধ্যে তিনটি ইন্সট্রুমেন্টও স্বাক্ষরিত হয়। ২০১৮ ও ২০১৯ সালে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরুর দুইটি প্রচেষ্টাও হয়েছিল। কিন্তু রাখাইনে সহায়ক পরিবেশ তৈরি না হওয়ায় বাছাইকৃত রোহিঙ্গারা সেখানে ফিরে যেতে অনিচ্ছা প্রকাশ করে। নাগরিকত্বের অনিশ্চয়তাসহ নিরাপত্তা ও সুরক্ষা, সহিংসতার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা, জীবিকা ও মৌলিক চাহিদা পূরণের সুযোগের অভাবের মতো ইস্যুগুলো নিয়ে তারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে।

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘মিয়ানমারের অব্যহত প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের প্রেক্ষিতে, বাংলাদেশ ত্রিপক্ষীয় মেকানিজমের মাধ্যমে চীনের সহায়তায় নতুন করে প্রত্যাবাসন আলোচনা শুরু করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত, এতে খুব একটা অগ্রগতি হয়নি। তিনি বলেন, কক্সবাজারে এখন বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী শিবির রয়েছে। এখানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মানবিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তায়, বাংলাদেশ এই বাস্তুচ্যূত রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা ও কল্যাণে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদেরকে খাবার, আশ্রয়, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য সেবা প্রদান করা হচ্ছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ তার জাতীয় কোভিড টিকাদান কর্মসূচিতে রোহিঙ্গাদেরও অন্তর্ভূক্ত করেছে। বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের ভাষায় পাঠ্যক্রম অনুসরণ, দক্ষতা বৃদ্ধি কার্যক্রম ও জীবিকা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছেন। এটা তাদের সংস্কৃতি ও ভাষা চর্চার অবদান রাখছে এবং দেশে ফিরে নিজস্ব সমাজে মিশে যেতে সহায়ক হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, অস্থায়ীভাবে প্রায় এক লাখ রোহিঙ্গাকে স্থানান্তরের জন্য আমরা নিজস্ব অর্থে ৩৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে ভাসান চর নামে একটি দ্বীপকে মানুষের বাসযোগ্য করে তুলেছি। এখন পর্যন্ত, প্রায় ৩১ হাজার রোহিঙ্গাকে সেখানে স্থানান্তর করা হয়েছে।