রণক্ষেত্র দিল্লি, দেখামাত্রই গুলির নির্দেশ

img

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

নাগরিকত্ব আইন সংশোধন নিয়ে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে যে সংঘাতের সূত্রপাত হয়েছিল, তা সহিংস রূপ ধারণ করেছে।

দুই পক্ষের মধ্যে তিন দিন ধরে চলা সংঘর্ষে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে উত্তর-পূর্ব দিল্লির বিভিন্ন এলাকা। একদল মানুষ লাঠি, রড নিয়ে মুসলিমদের ওপর সংঘবদ্ধভাবে আক্রমণ চালাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পুড়িয়ে দিচ্ছে মুসলিমদের বাড়িঘর ও দোকান। অনেক জায়গায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় বিক্ষোভকারীদের দেখামাত্রই গুলির নির্দেশ দেয়া হয়েছে। জারি করা হয়েছে সান্ধ্য আইন।

দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে ইতিমধ্যে এক পুলিশ কর্মকর্তাসহ ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন দুই শতাধিক।

দফায় দফায় সংঘর্ষে মঙ্গলবার রণক্ষেত্রে রূপ নিয়েছিল দিল্লির মুসলমান অধ্যুষিত উত্তর-পূর্বাঞ্চল। গত কয়েক দশকেও দিল্লিতে এমন সহিংসতা দেখা যায়নি বলে বিবিসির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মঙ্গলবার কয়েকটি এলাকায় সান্ধ্য আইন জারি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে টাইমস অব ইন্ডিয়া। সংঘর্ষ চরম আকার ধারণ করায় সোমবারই দিল্লির একাধিক মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা হয়েছিল। মঙ্গলবারও জাফরাবাদ, মৌজপুর-বাবরপুর, গোকুলপুরী, জোহরি এনক্লেভ ও শিব বিহার স্টেশন বন্ধ রাখা হয়। উত্তর-পূর্ব দিল্লির সমস্ত সরকারি ও বেসরকারি স্কুল বন্ধ রাখা হয়েছে।

উত্তেজনা যেন না ছড়ায়, সেজন্য বেসরকারি টেলিভিশনগুলোকে সংঘাতের খবর প্রচারের ক্ষেত্রে সাবধান করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। বলা হয়েছে, এমন কোনও খবর প্রকাশ করা যাবে না, যা হিংসায় মদদ জোগাতে পারে।

মঙ্গলবার রাতে জাফরাবাদ, মৌজপুর, চাঁদবাগ, কারওয়াল নগরে সান্ধ্য আইন (কারফিউ) জারি করে বিক্ষোভকারীদের দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দিয়েছে দিল্লি পুলিশ।

মঙ্গলবার ৬৭ কোম্পানি আধাসামরিক বাহিনীকে পরিস্থিতি মোকাবিলায় নিয়োগ করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনা মোতায়েনের দাবি উঠলেও প্রশাসন জানিয়েছে, যথেষ্ট সিআরপি নামানো হয়েছে। এখনই সেনা ডাকার দরকার নেই। তবে সেনাবাহিনীকে তৈরি রাখা হয়েছে।

বুধবার সকালে দিল্লি পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার দাবিতে মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালের বাড়ির সামনে বিক্ষোভ দেখাতে জড়ো হয়েছিলেন জামিয়া ও জেএনইউয়ের ছাত্ররা। পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করতে জলকামান প্রয়োগ করেছে বলে জানা গেছে।

পরিস্থিতি সরেজমিনে পরিদর্শনে মঙ্গলবার মধ্যরাতে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল হিংসা কবলিত এলাকায় গিয়েছিলেন। উত্তর-পূর্ব দিল্লির পুলিশের ডেপুটি কমিশনারের সঙ্গে বৈঠকও করেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল। পরিস্থিতির খোঁজখবর নেন তিনি। সূত্রের খবর, পুলিশকে হিংসা দমনে পূর্ণ স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে।

পুলিশ দাবি করেছে, হিংসায় যুক্ত থাকার অভিযোগে ২০ জনকে আটক করেছে। উত্তর-পূর্ব দিল্লিতে ঢোকার ৩টি পথ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

দিল্লি পুলিশের স্পেশাল কমিশনার জানিয়েছেন, জাফরাবাদ ও মৌজপুর চক থেকে বিক্ষোভকারীদের তুলে দেয়া হয়েছে। রবিবার থেকে জাফরাবাদ মেট্রো স্টেশনের সামনে মহিলারা নাগরিকত্ব আইন ও এনআরসির বিরুদ্ধে অবস্থান শুরু করার পর থেকেই নাগরিকত্ব আইনের পক্ষ নিয়ে একদল আক্রমণ শুরু করে। এরপর থেকেই শহরের ভজনপুরা ও মৌজপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় নাগরিকত্ব আইনের বিরোধী ও সমর্থকদের মধ্যে তুমুল সংঘর্ষ শুরু হয়। একে অপরকে লক্ষ্য করে ইট নিক্ষেপ করেছে। তবে জয় শ্রীরাম ধ্বনি দিয়ে একদল যুবক বেপরোয়াভাবে আগুন লাগানো থেকে শুরু করে আন্দোলনকারীদের উপর আক্রমণ চালিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

উত্তর-পূর্ব দিল্লির গুরু তেগবাহাদুর হাসপাতালে গুরুতর আহতের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। ফলে মৃত্যুও বাড়ার আশঙ্কা। হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আহতদের প্রায় অর্ধেক গুলিবিদ্ধ। সোমবার দিল্লি পুলিশের কনস্টেবল রতন লালের মৃত্যু হয়। প্রথমে জানা গিয়েছিল, মাথায় পাথরের চোট লেগে মার যান রতন। ময়নাতদন্তে জানা গেল, তার বাম কাঁধ দিয়ে গুলি ঢোকে। ডান কাঁধ থেকে সেই গুলি উদ্ধার হয়েছে।

গত মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে নিয়ে বৈঠকে বসেছিলেন। সেখানেই আইন শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। মঙ্গলবার রাতেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিল্লি পুলিশের আধিকারিকদের সঙ্গে বৈঠকে বসেছিলেন। মঙ্গলবার রাতে নজিরবিহীনভাবে দিল্লি হাইকোর্ট দিল্লি পুলিশকে এক নির্দেশে উপদ্রুত এলাকা থেকে আহতদের নিরাপদে হাসপাতালে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করতে বলেছেন। জানা গেছে, আজ সুপ্রিম কোর্টেও দিল্লির পরিস্থিতি নিয়ে শুনানি হবে।